বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট নিয়ে আইইএর সতর্কবার্তা
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আইইএ প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের সব বড় জ্বালানি সংকটকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবার অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান সংকটের মাত্রা অতীতের বড় জ্বালানি বিপর্যয়গুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার মতে, সত্তরের দশকের তেল সংকট কিংবা সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ—এসব ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবও বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় কম।
বিরোলের ব্যাখ্যায়, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে গেছে, যা অতীতের বড় সংকটগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
শুধু তেলই নয়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি কিউবিক মিটার, যা ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার সংকটের তুলনায় অনেক বেশ
আইইএ প্রধান আরও জানান, চলমান সংঘাতের কারণে অন্তত ৯টি দেশের ৪০টির বেশি জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও পড়তে শুরু করেছে। তবে তার মতে, নীতিনির্ধারকেরা এখনো এই সংকটের গভীরতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি।
সংকট মোকাবিলায় আইইএর সদস্য দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বিভিন্ন দেশে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বাসা থেকে কাজের সুযোগ বাড়ানো, গাড়ি ভাগাভাগি এবং সড়কে গতিসীমা কমানো।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও কৌশলগত তেল মজুত ছাড়ার বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান বিরোল। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় হলো হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি সচল করা।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলার পর থেকে এই নৌপথ কার্যত অচল হয়ে আছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা কখনো কখনো ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে।
এর জবাবে ইরান পাল্টা সতর্ক করে জানায়, তাদের অবকাঠামোতে হামলা হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং আঞ্চলিক জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প জানান, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার কথাও ঘোষণা করেন।
সব মিলিয়ে, দ্রুত সমাধানের আশা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কোন মন্তব্য নেই