আলী খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করলেই কি ইরানে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে? নাকি তেহরান পরিণত হবে ধ্বংসস্তূপে? পশ্চিমা বিশ্বের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের ফর্মুলা মধ্যপ্রাচ্যে কতটা সফল, তা নিয়ে উঠে এসেছে গভীর শঙ্কার চিত্র।
খামেনির পতনের পর কি ইরানে শান্তি ফিরবে, নাকি দেশটি ইরাক ও লিবিয়ার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে? আল–জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের চিত্র। ইরানের গৃহযুদ্ধ ও ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই বিদেশি হস্তক্ষেপকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে গত জানুয়ারির দমন-পীড়ন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো বিশ্বনেতাদের উসকানিমূলক আহ্বানের পর, খামেনির পতনকে অনেকেই ‘নিশ্চিত সমাধান’ ভাবছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমীকরণ মোটেও সরল নয়।
ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ কী বলছে?
আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া—এই তিন দেশের পরিণতি চোখের সামনে জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান ও ভূ-রাজনীতির ইতিহাস বলছে, বিদেশি আগ্রাসনে স্বৈরশাসকের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রগুলোতে স্থিতিশীলতা ফেরেনি।
আফগানিস্তান: ২০০১ সালের মার্কিন অভিযানের পর দুই দশক ধরে চলেছে রক্তপাত। শেষমেশ পুরনো শাসকরাই ক্ষমতায় ফিরেছে, কিন্তু শান্তি অধরাই রয়ে গেছে।
ইরাক: সাদ্দাম হোসেনের পতনের দুই দশক পরেও দেশটি গৃহযুদ্ধ আর অস্থিতিশীলতার চোরাবালি থেকে বের হতে পারেনি।
লিবিয়া: ন্যাটোর হস্তক্ষেপের পর লিবিয়া আজ কার্যত রাষ্ট্রহীন। ত্রিপোলি ও বেনগাজি—দুই ভাগে বিভক্ত দেশটি ধুঁকছে অস্তিত্ব সংকটে।
‘শাহাদাত’ বনাম পরাজয়
ইরানকে ইরাক বা লিবিয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী ইরানি সমাজে ‘মৃত্যু’ বা ‘হত্যাকাণ্ড’ সব সময় পরাজয় নয়। খামেনি যদি কোনো বিদেশি শক্তির হামলায় নিহত হন, তবে শিয়া দর্শনে তিনি ‘শহীদ’-এর মর্যাদা পাবেন।
এটি ইরানিদের মনোবল ভাঙার বদলে উল্টো ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র আবেগে সবাইকে এক করতে পারে। তখন শাসকের সমালোচকরাও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেন। অর্থাৎ, যাকে ‘পতন’ ভাবা হচ্ছে, তা আদতে একটি পবিত্র প্রতিরোধের জন্ম দিতে পারে।
গৃহযুদ্ধের বারুদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ
খামেনিবিহীন ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে তা পূরণ করবে কে? দেশে বর্তমানে সর্বজনগ্রাহ্য কোনো নেতা নেই। হাসান রুহানি বা আলী লারিজানির মতো টেকনোক্র্যাটদের প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলেও ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক গ্রহণযোগ্যতা নেই।
এ অবস্থায় যদি সামরিক বাহিনী (আইআরজিসি ও আরতেশ) এবং আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে:
- সশস্ত্র সংঘাত: বাসিজ বা রেভোল্যুশনারি গার্ডের কট্টরপন্থীরা নতুন সরকারের বশ্যতা স্বীকার না করে বিদ্রোহী গ্রুপে পরিণত হতে পারে।
- দেশ ভাগের শঙ্কা: ইরান বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হলে কুর্দি, বালুচ ও আরব সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
- মধ্যবিত্তের অনুপস্থিতি: দীর্ঘ অবরোধে ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তারা স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে না। এই সুযোগে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিতে পারে।
উপসংহার
একজন শাসকের ‘তিক্ত বিদায়’ হয়তো সাময়িক উল্লাস আনতে পারে, কিন্তু তা যদি রাষ্ট্রের কাঠামোই ভেঙে দেয়, তবে সেই ভুলের মাশুল দিতে হবে যুগের পর যুগ। আল-জাজিরার নিবন্ধে অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান সতর্ক করেছেন—খামেনির পতন হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তা মধ্যপ্রাচ্যে এক অনন্ত অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
মোঃ রাজু আহমেদ

কোন মন্তব্য নেই: