ইরানের হামলায় বাইদু প্রযুক্তির ছায়া
ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্ভুলতা কি চীনের বাইদু নেভিগেশন সিস্টেমের কারণে? জিপিএস ছেড়ে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান-এর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিখুঁততা নতুন করে বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে অনেক গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞ ধারণা করছেন, দেশটি হয়তো চীন-এর বাইদু স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে, যা তাদের আঘাতের সক্ষমতাকে আরও উন্নত করেছে।
ফ্রান্সের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যালেইন জুইলেট এক আলোচনায় উল্লেখ করেন, কয়েক মাস আগের সংঘাতের তুলনায় বর্তমানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা অনেক বেশি উন্নত। তার মতে, এই পরিবর্তন মূলত গাইডেন্স প্রযুক্তির অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয় এবং এর পেছনে নতুন কোনো নেভিগেশন সিস্টেম যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার পর ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে। ইসরায়েল এবং মিত্ররা অনেক হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও কিছু আঘাত প্রতিরক্ষা ভেদ করে ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অতীতে ইরান তাদের সামরিক ব্যবস্থায় গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএস ব্যবহার করত, যা যুক্তরাষ্ট্র-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সিস্টেমে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের থাকায় বিকল্প প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে বাইদু ব্যবহারের সম্ভাবনা সামনে আসে।
চীন ২০২০ সালে তাদের এই নেভিগেশন ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ চালু করে, যা উদ্বোধন করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। বাইদু বর্তমানে জিপিএসের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে ব্যবহৃত স্যাটেলাইটের সংখ্যা অন্যান্য সিস্টেমের তুলনায় বেশি, যা নির্ভুলতা বাড়াতে সহায়ক।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সংকেত নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নির্ভুলতা সীমিত হলেও সামরিক ব্যবহারে এটি অনেক বেশি উন্নত মানের তথ্য সরবরাহ করতে পারে।
তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই বাইদু ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেনি। তবুও বিভিন্ন বিশ্লেষণ বলছে, দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প নেভিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পর থেকে এ ধরনের উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি হয় এবং ২০২১ সালে চীন-ইরান কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার হওয়ার পর এতে গতি আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান সত্যিই বাইদু প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে, তাহলে এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।
এছাড়া এই পরিস্থিতি চীনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নত অস্ত্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কেও মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ হিসেবে ধরা হয়। এসব অস্ত্র বিভিন্ন দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম এবং মোবাইল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে রাখার কারণে এগুলোর সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা কঠিন।
অন্যদিকে, ইরানের ব্যবহৃত কম খরচের ড্রোন প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তুলনামূলক সস্তা এই ড্রোন প্রতিহত করতে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিয়েও ভাবছে।
সব মিলিয়ে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইট নেভিগেশন প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে প্রযুক্তিই হয়ে উঠছে যুদ্ধের অন্যতম নির্ধারক শক্তি।
কোন মন্তব্য নেই