চট্টগ্রামে ভোট সহিংসতা: বিচারহীন ১১ হত্যা
চট্টগ্রামে নির্বাচনী সহিংসতায় গত এক দশকে ১১ জন নিহত হলেও কোনো হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি। তদন্ত ও বিচার বিলম্বে বাড়ছে উদ্বেগ ও হতাশা।
চট্টগ্রামে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে গত এক দশকে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১১ জন নিহত হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। দীর্ঘ সময় পার হলেও আইনি নিষ্পত্তি না হওয়ায় হতাশা ও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।
আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচনী সহিংসতায় এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে নয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে এবং দুজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যান। দায়ের করা ১১টি মামলার মধ্যে আটটি এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে, আর তিনটির তদন্তই সম্পন্ন হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরীর মতে, বিচার ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা অপরাধপ্রবণতা বাড়াতে পারে। তাঁর ভাষায়, অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা পুনরাবৃত্তি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
জনসংযোগ কর্মসূচিতে গুলিতে নিহত
গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণার সময় গুলিতে নিহত হন সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা। একই ঘটনায় প্রার্থীসহ আরও পাঁচজন আহত হন। ঘটনাটি ঘটে খন্দকারপাড়া এলাকায়।
পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তি একাধিক মামলার আসামি ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে একজন বাঁহাতি শুটার তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলাকারীর পরিচয় শনাক্তে তদন্ত চলছে। মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে ৯ ডিসেম্বর আবার প্রচারণায় অংশ নেন এরশাদ উল্লাহ এবং পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধার ও হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি এখনো আতঙ্কে থাকেন। নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন শুটারকে শনাক্তে কাজ অব্যাহত আছে।
সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে প্রাণহানি
২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নে ইউপি নির্বাচন ঘিরে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. তাসিফ নিহত হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে এবং মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মো. জসিম বলেন, সন্তানের হত্যার বিচার কবে মিলবে তা তিনি জানেন না।
একই দিনে বাজালিয়া ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের সংঘর্ষে আবদুস শুক্কুর নামে এক যুবক গুলিতে নিহত হন। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে গিয়ে সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন। এই মামলাটিও বর্তমানে সাক্ষ্য পর্যায়ে রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৪ ফেব্রুয়ারি চন্দনাইশ পৌরসভা নির্বাচনে গাছবাড়িয়া এলাকায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় কলেজশিক্ষার্থী হাবিবুর ইসলাম গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। পিবিআই এই ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। নিহতের মা ছকিনা খাতুন বলেন, জীবদ্দশায় ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখতে চান তিনি।
সিটি নির্বাচনে সহিংসতা
২০২১ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে পৃথক দুই ঘটনায় গুলিতে নিহত হন দুজন। ১২ জানুয়ারি আগ্রাবাদের মগপুকুরপাড় এলাকায় আওয়ামী লীগের সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর অনুসারীদের সংঘর্ষে নিহত হন আজগর আলী। ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা বর্তমানে জামিনে আছেন এবং তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) মাহাবুব আলম খান জানান, ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে, তবে গুলি কারা চালিয়েছে তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতের ছেলে সেজান মাহমুদ বলেন, তদন্তের অগ্রগতি দেখে বিচার পাওয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
একই বছরের ২৭ জানুয়ারি নির্বাচনের দিন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দিনমজুর আলাউদ্দিন। মামলাটি বর্তমানে সিআইডির তদন্তাধীন। নিহতের বোন জাহানারা বেগম বলেন, এত বছরেও হত্যাকারীদের পরিচয় জানা যায়নি।
ফটিকছড়িতে ছুরিকাঘাতে মৃত্যু
২০২১ সালের ১১ নভেম্বর ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শফি। দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ চলাকালে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনী সহিংসতা
২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পটিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় পৃথক ঘটনায় তিনজন নিহত হন। পটিয়ায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী দ্বীন মোহাম্মদ এবং ইসলামী ফ্রন্ট কর্মী আবু সাদেক নিহত হন। একই দিনে বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হন জাতীয় পার্টির কর্মী আহমদ কবীর।
দ্বীন মোহাম্মদের স্ত্রী পারভীন আক্তার জানান, মামলার সাক্ষ্য এখনো শেষ হয়নি এবং মামলা করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি বর্তমানে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ড
২০১৬ সালের ৫ মে হাটহাজারীর মির্জাপুর ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণার সময় গুলিতে নিহত হন যুবলীগ কর্মী নুরে এলাহী। তদন্ত শেষে ২০২০ সালে পিবিআই অভিযোগপত্র দেয়, যেখানে সাবেক কাউন্সিলর তৌফিক আহমেদকে আসামি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বৈঠকের সময় ছোড়া গুলির একটি তাঁর বুকে লাগে। ব্যবহৃত পিস্তল উদ্ধার হয়নি। মামলাটি বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য পর্যায়ে রয়েছে এবং আসামি জামিনে আছেন।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আশরাফ হোসেন চৌধুরী জানান, নির্ধারিত দিনে সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং মামলাজট বিচার বিলম্বের বড় কারণ। তবে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্রপক্ষ উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী সহিংসতার মামলাগুলোর বিচার ঝুলে থাকায় ভবিষ্যৎ নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। নিহতদের পরিবারের প্রত্যাশা—দীর্ঘ অপেক্ষার পর হলেও যেন ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।

কোন মন্তব্য নেই