ফাঁদে ট্রাম্প: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আত্মঘাতী লড়াই।
নেতানিয়াহুর ফাঁদে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে নতুন যুদ্ধে জড়িয়েছে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র। এতে উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা ও মার্কিন আধিপত্য কতটা ঝুঁকিতে? আন্তর্জাতিক রাজনীতির পেছনের খবর জানুন।
ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সতর্ক অবস্থানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন প্রশাসনকে ফের এক অন্তহীন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একসময় মার্কিন নীতিনির্ধারকরা যে পরিস্থিতি যেকোনো মূল্যে এড়াতে চেয়েছিলেন, ঠিক সেই ফাঁদেই পা দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
ফিরে আসছে ইরাক অভিযানের দুঃসহ স্মৃতি
২০০৩ সালে নব্যরক্ষণশীলদের ‘নিউ আমেরিকান সেঞ্চুরি’ মতাদর্শে ভর করে ইরাকে যে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তার অদ্ভুত মিল পাওয়া যাচ্ছে। সেবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটলেও, নতুন কোনো মার্কিন আধিপত্য কায়েম হয়নি। উল্টো বাগদাদের পতন জন্ম দিয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনাশ এবং হাজারো মার্কিন সেনার মৃত্যু বিশ্বদরবারে আমেরিকার ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছিল।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার জেরে মার্কিন রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল আসে। বারাক ওবামা ক্ষমতায় বসেন ইরাক যুদ্ধের ভুল স্বীকার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের মন জয় করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের এই অন্তহীন রণক্ষেত্র থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখার আশ্বাস দিয়ে।
নেতানিয়াহুর সুকৌশলী চাল ও ট্রাম্পের ইউটার্ন
ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্পকে সেই পুরোনো আগুনেই পুনরায় টেনে এনেছেন নেতানিয়াহু। তেহরানের সাথে সরাসরি সংঘাত বাঁধানোই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্য হাসিলে তিনি ওয়াশিংটনে ঘন ঘন সফর, ক্রমাগত রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং জ্যারেড কুশনারের মতো ট্রাম্পের একান্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাবকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন।
ইসরায়েল মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এই মিথ্যা আশ্বাস দিতে সক্ষম হয় যে, ইরানিদের ওপর জোরালো আঘাত হানলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণ রাতারাতি বদলে যাবে। ফলস্বরূপ, তেহরানের শীর্ষ কর্তাদের নিশানা করে সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেয় হোয়াইট হাউস।
মিথ্যার বেসাতি বনাম যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা
অথচ, রাতারাতি বিজয় অর্জনের যে স্বপ্ন নেতানিয়াহু দেখিয়েছিলেন, তা এখন মরীচিকা। মূলত, আমেরিকার মাটিতে হামলা চালানোর কোনো পূর্বপরিকল্পনা তেহরানের ছিল না, এমনকি তাদের এমন কোনো কৌশলগত মারণাস্ত্রও নেই যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি বিপদের কারণ হতে পারে।
২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের ইউরেনিয়াম কর্মসূচি সীমিত রেখেছিল। খোদ আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরাও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন। এমনকি পরবর্তী আলোচনাগুলোতেও তারা সমৃদ্ধকরণ কমানোর ইঙ্গিত দেয়। অথচ কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করে বসেন, মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামো সম্পূর্ণ ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে।
অতীতের সংঘাতগুলোতে তেল আবিব নিজেই লড়াই করত, আর পেন্টাগন কেবল অস্ত্র বা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে মদত জোগাত। কিন্তু এবার তেল আবিবের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সরাসরি রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়েছে।
ঝুঁকিতে উপসাগরীয় মিত্ররা, লাভ শুধু ইসরায়েলের
পুরো আরব বিশ্ব যখন আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কিত, তখন একমাত্র লাভবান পক্ষ হলো ইসরায়েল। তাদের নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে বা তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালে তেল আবিবের আধিপত্য আরও নিষ্কণ্টক হবে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে আমেরিকার দীর্ঘদিনের একটি অলিখিত নিরাপত্তা চুক্তি ছিল। চুক্তিটি হলো—আরব রাষ্ট্রগুলো মার্কিন অর্থনীতিতে বিপুল অর্থ ঢালবে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটির জায়গা দেবে, আর বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
২০২৫ সালের ট্রাম্পের উপসাগর সফরের সময় সৌদি আরব, কাতার ও আমিরাত কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পেও এই অর্থের প্রবাহ ঘটেছে।
জ্যারেড কুশনারের ‘অ্যাফিনিটি পার্টনার্স’-এ সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড একাই ২ বিলিয়ন ডলারের বিশাল লগ্নি করেছে।
কিন্তু মিত্রদের কোনো পূর্বসতর্কতাকে তোয়াক্কা না করে এই যুদ্ধ শুরু করায় পুরো নিরাপত্তাকাঠামোটি এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
আরব ভূখণ্ডে ক্ষোভ ও আতঙ্কের আগুন
মিত্রদের এই ক্ষোভের সুর শোনা গেছে প্রভাবশালী আমিরাতি ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর-এর কণ্ঠে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—আক্রমণের আগে কি এর ভয়াবহ পরিণতির কথা আদৌ ভাবা হয়েছিল? কারণ এই উত্তেজনার প্রথম বলি হবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই।
(ছবি: রয়টার্স। ক্যাপশন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা তেল শিল্প এলাকার একটি স্থাপনায় হামলার পর সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও ধোঁয়া। ফুজাইরা মিডিয়া অফিসের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের মধ্যে গত ৪ মার্চ ফুজাইরায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়)
উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন এই দেশগুলোর জন্যই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো প্রভাবশালী নেতারা সৌদি আরবকে সরাসরি যুদ্ধে নামার উসকানি দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি একটি বৃহত্তর ইরান-ইরাক ধাঁচের যুদ্ধের অশনিসংকেত দিচ্ছে।
আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
জ্বালানি সম্পদের কেন্দ্রবিন্দু এবং বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের উৎস এই মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে ইসরায়েলের কৌশলগত ছকে পা দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকেই খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। উপসাগরীয় মিত্ররা এখন উপলব্ধি করছে, যাকে তারা রক্ষক ভেবেছিল, সেই ব্যবস্থাই আজ তাদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ।
যুদ্ধ যত এগোবে, এই সত্য ততই প্রকট হবে। আমেরিকার জন্য এখন আসল মাথাব্যথা ইরান নয়, বরং ইসরায়েল। তেল আবিবের অন্ধ অনুকরণ কি সত্যিই ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি তাদের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভিত্তিমূলকে একটু একটু করে ধ্বংস করে দিচ্ছে?
কোন মন্তব্য নেই