লক্ষ্যভেদী ইরানি মিসাইল | নেপথ্যে কি চীনের ‘বাইদু’?

ডেস্ক রিপোর্ট | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, ইরানের মিসাইল হামলা, চীনের বাইদু নেভিগেশন, জিপিএস বনাম বাইদু, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সংবাদ, ব্যালিস্টিক মিসাইল, শাহেদ ড্রোন, আজকের খবর, Iran vs Israel.

জিপিএস বাদ দিয়ে ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁত হামলা চালাতে ইরান কি চীনের 'বাইদু' (Beidou) স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে? মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্য জানুন।



ইসরায়েল এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক অব্যর্থ আঘাত হানছে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল। এই অবিশ্বাস্য লক্ষ্যভেদের পেছনে মার্কিন গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের (জিপিএস) বদলে বেইজিংয়ের অত্যাধুনিক 'বাইদু' (Beidou) নেভিগেশন প্রযুক্তি কাজ করছে বলে অভিমত গোয়েন্দা মহলের।

আল-জাজিরায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।


আকস্মিক এই নিখুঁত নিশানার রহস্য কী?

ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা ‘ডিজিএসই’-এর প্রাক্তন প্রধান (২০০২-২০০৩) অ্যালেইন জুইলেট সম্প্রতি 'তুকসান' নামের একটি পডকাস্টে এই বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি জানান, গত জুনে ঘটা ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে তেহরানের মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেমে অভাবনীয় উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। আট মাস আগের তুলনায় তাদের বর্তমান স্ট্রাইকগুলো এতটাই নিখুঁত যে, এর নেপথ্যের প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন সমরবিদরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণ এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ ইরানি নেতাদের গুপ্তহত্যার চরম প্রতিশোধ নিচ্ছে তেহরান। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনা ও ইসরায়েলে শয়ে শয়ে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে তারা। যদিও এর একাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও বহু মিসাইল রাডার ফাঁকি দিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটিয়েছে।

জিপিএসের বিকল্প হিসেবে 'বাইদু'-এর উত্থান

আগে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত জিপিএস-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল ইরানের সামরিক বাহিনী। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ওয়াশিংটন যেকোনো মুহূর্তে এই সিগন্যাল বিকল করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতেই চীনের তৈরি স্যাটেলাইট ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে তারা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

১৯৯৬ সালে তাইওয়ান সংকটের সময়ই নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয় বেইজিং। দীর্ঘ গবেষণার পর ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং জিপিএসের শক্ত বিকল্প হিসেবে 'বাইদু'-এর সর্বশেষ সংস্করণের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।

আল-জাজিরার এজে ল্যাবসের পরিসংখ্যান বলছে, মহাকাশে মার্কিন জিপিএস, ইউরোপের গ্যালিলিও এবং রাশিয়ার গ্লোনাস—এই তিনটির প্রতিটিতেই ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে চীনের বাইদু নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে মোট ৪৫টি কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে। স্পেস, গ্রাউন্ড এবং ইউজার—এই তিন স্তরে বিভক্ত বাইদু সিস্টেম সাধারণ সংকেতের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে নির্ভুল অবস্থান জানাতে সক্ষম। তবে ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ারের মতে, সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত সিগন্যালগুলো এর চেয়েও বহুগুণ বেশি নিখুঁত।

কবে থেকে এই রূপান্তর শুরু?

তেহরান সরাসরি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা স্বীকার করেনি। গত জুনের যুদ্ধের পর ইরানের আইসিটি মন্ত্রণালয় কেবল জানিয়েছিল, তারা কোনো একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে চায়নামেড প্রজেক্টের গবেষক থিও নেনসিনির মতে, এই রূপান্তরের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক আগে:

  • ২০১৫ সাল: সামরিক বাহিনীতে বাইদু-২ ব্যবহারের জন্য চুক্তি করে ইরান।
  • ২০২১ সাল: চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে তেহরানকে বাইদুর 'এনক্রিপ্টেড সামরিক সংকেত' ব্যবহারের ছাড়পত্র দেয় বেইজিং।
  • ২০২৪ সালের এপ্রিল: ইসরায়েলে চালানো হামলায় প্রথম বাইদুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
  • ২০২৫ সালের জুন: মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরই সামরিক ও বেসামরিক লজিস্টিকস সম্পূর্ণভাবে বাইদুতে স্থানান্তর করে ইরান।

চীনের ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা ও আমেরিকার নতুন সংকট

গবেষক থিও নেনসিনির বিশ্বাস, বর্তমান পরিস্থিতিকে চীন তাদের নেভিগেশন প্রযুক্তির একটি ‘লাইভ ফিল্ড টেস্ট’ বা বাস্তব পরীক্ষা হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের রাডার ফাঁকি দেওয়া এবং বাইদু-নিয়ন্ত্রিত মিসাইল আটকাতে আমেরিকার সক্ষমতা যাচাই করতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে বেইজিং। এটি সফল হলে ওই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও জিপিএসের ওপর আস্থা হারিয়ে বিকল্প ভাবতে শুরু করবে।

অন্যদিকে, ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল রয়েছে ইরানের হাতে। জুইলেটের ভাষায়, ফ্রান্সের চেয়ে তিন গুণ বড় একটি দেশে ট্রাকে করে এগুলো এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে যে, মার্কিন বাহিনীর পক্ষে সব লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।

এরই মধ্যে নতুন এক শঙ্কার মুখে পড়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন। ইরানের পাঠানো সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোনগুলোকে ধ্বংস করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত তলানিতে ঠেকেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শাহেদ ড্রোন রুখতে ইউক্রেনের তৈরি সস্তা ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তির সহায়তা চাইছে পেন্টাগন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.