এক লাফে ১২০০ টাকা বাড়ল বিমানভাড়া!
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬, ১১:৩০
বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার পরদিনই বেড়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের বিমানভাড়া। ইউএস বাংলা ও এয়ার অ্যাস্ট্রাসহ বেসরকারি এয়ারলাইনগুলো ১২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছে। এতে যাত্রী কমার শঙ্কা ও পর্যটন খাতে প্রভাব পড়তে পারে।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে উড়োজাহাজের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ১০৭ টাকা লাফিয়েছে। জ্বালানির এই আকাশছোঁয়া দাম নির্ধারণের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ ৬টি রুটে বিমানভাড়া এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো।
জ্বালানির বাজারে কেন এই অস্থিরতা?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন দরের কথা নিশ্চিত করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জের ধরেই বৈশ্বিক বাজারে এই প্রভাব পড়েছে।
বিইআরসি জানায়, গত ৮ মার্চ প্রথম ধাপে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের এভিয়েশন জ্বালানি লিটারে ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। সবশেষ মঙ্গলবার রাতে এক ধাক্কায় আরও ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা বাড়ানো হয়। এই দুই ধাপে দাম বেড়ে বর্তমানে প্রতি লিটার জেট ফুয়েল বিক্রি হচ্ছে ২০২ টাকা ২৯ পয়সায়।
পকেটে টান যাত্রীদের, ঝুঁকিতে পর্যটন
একটি ফ্লাইটের মোট পরিচালন খরচের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগই চলে যায় তেলের পেছনে। ফলে তেলের বাজার চড়লে টিকিটের দামও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আকাশপথে খরচ বৃদ্ধির কারণে ভ্রমণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে। এর নেতিবাচক ধাক্কা সরাসরি গিয়ে লাগবে দেশের হোটেল, মোটেল ও সার্বিক পর্যটন শিল্পে।
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব মফিজুর রহমানের মতে, টিকিটের মূল্য সামান্য ৫০০ টাকা বাড়লেও মানুষ সড়কপথ বা ভিন্ন মাধ্যম বেছে নিতে শুরু করেন। বুকিং তলানিতে নামলে বাধ্য হয়ে ফ্লাইট বাতিলের মতো পথে হাঁটতে হয় এয়ারলাইনসগুলোকে।
কোন এয়ারলাইনসের কী অবস্থা?
ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস:
বর্তমানে ১০টি দেশের ১৫টি রুটে এবং দেশের ভেতরের ৬টি গন্তব্যে (ঢাকা, সিলেট, কক্সবাজার, রাজশাহী, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রাম) ফ্লাইট পরিচালনা করছে সংস্থাটি। তাদের বহরে আছে ২৫টি উড়োজাহাজ। সংস্থাটির সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৫০ টাকায়। প্রতিষ্ঠানটির জিএম কামরুল ইসলাম বুধবার জানান, তারা মূল ভাড়া বা বেস ফেয়ার বাড়াননি। কেবল খরচ সামলাতে ‘ফুয়েল সারচার্জ’ যোগ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর কমলে এই সারচার্জও কমে আসবে।
এয়ার অ্যাস্ট্রা:
প্রতিদিন অভ্যন্তরীণ ৪টি রুটে ২৪টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে এই সংস্থাটির দরকার হয় প্রায় ১৬ হাজার লিটার জ্বালানি। সিইও ইমরান আসিফ জানান, একটি ফ্লাইটের খরচ ওঠাতে গড়ে ৮০ শতাংশ আসন পূর্ণ হওয়া জরুরি। কিন্তু ভাড়ার চাপে যাত্রী যদি ৬০ শতাংশ বা তার নিচে নেমে যায়, তবে লোকসান গুনতে হবে। সাময়িক সারচার্জ দিয়ে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে এমন অবস্থা চলতে থাকলে এভিয়েশন খাতের টিকে থাকাই হুমকিতে পড়বে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস:
সরকারি পতাকাবাহী এই সংস্থাটি এখনো টিকিটের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। বুধবার প্রথম আলোকে সংস্থাটির বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলম জানান, পরিস্থিতি নিয়ে খুব দ্রুতই তারা আলোচনায় বসবেন। পর্যালোচনার পর প্রয়োজন সাপেক্ষে ভাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্র কেমন?
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে প্রভাব পড়লেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে:
ভারত ও নেপালে স্থিতিশীলতা:
ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ফেব্রুয়ারির ৯১.৩৯ রুপির এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল এখন সামান্য বেড়ে ৯৬.৬৪ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে নেপাল অয়েল করপোরেশনের চার্টে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি থেকেই সেখানে দাম স্থিতিশীল। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য লিটারপ্রতি ১২৭ রুপি এবং বিদেশি এয়ারলাইনসের জন্য দশমিক ৯৭ ডলার নেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তানে রেকর্ড বৃদ্ধি:
পাকিস্তানের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। সংবাদমাধ্যম 'পাকিস্তান টুডে'-এর প্রতিবেদন বলছে, দেশটি এক ধাক্কায় জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৮২ শতাংশ বাড়িয়েছে। আগে যা ১৮৮ দশমিক ৯৩ রুপি ছিল, তা এখন ৩৪২ দশমিক ৩৭ পাকিস্তানি রুপিতে গিয়ে ঠেকেছে।
কোন মন্তব্য নেই