লোক সভায় তৃণমূলে ভাঙন, ২০ সাংসদের আলাদা ব্লকের দাবি
নয়াদিল্লি:
লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ভাঙনের দাবি। ২০ সাংসদের পৃথক ব্লকের আবেদন ও এনডিএকে সমর্থনের জল্পনায় সরগরম ভারতের রাজনীতি।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় দলে সম্ভাব্য ভাঙনের খবর। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী, লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদ স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পৃথক সংসদীয় ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেছেন। পাশাপাশি তাঁরা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই নতুন উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। একসময় তিনি লোকসভায় তৃণমূলের দলনেত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও সম্প্রতি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপনেতা হিসেবে আছেন অভিনেত্রী ও বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে যেসব সাংসদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে আছেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, পার্থ ভৌমিক, বাপি হালদার, জগদীশ বাসুনিয়া, শর্মিলা সরকার, কালীপদ সোরেন, অরূপ চক্রবর্তী, খলিলুর রহমান, আবু তাহের, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া, দীপক (দেব) অধিকারী এবং ইউসুফ পাঠান। এছাড়া সাজদা আহমদ, প্রতিভা মণ্ডল, মিতালি বাগ ও শত্রুঘ্ন সিনহাও ওই আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে অসন্তোষের খবর রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, ১০ জুনের দিকে এই ভাঙনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসবে। তবে সোমবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র বৈঠকের দিনই ঘটনাপ্রবাহ নাটকীয় মোড় নেয়। ওই বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লিতে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
একই দিনে তৃণমূলের প্রবীণ রাজ্যসভা সদস্য সুখেন্দু শেখর রায় সংসদ সদস্যপদ এবং দলীয় সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর তিনি অভিযোগ করেন, দল সাধারণ মানুষের অনুভূতি থেকে দূরে সরে গেছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেয়নি।
পদত্যাগের পর তিনি কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সরকারি বাসভবনে যান। সেখানে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিজেপি নেতা নিশিকান্ত দুবে ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবও উপস্থিত ছিলেন। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ওই বৈঠকে যোগ দেন।
দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০ জন সাংসদ লোকসভার স্পিকারের কাছে পৃথক ব্লক হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন জানাবেন এবং এনডিএকে সমর্থন করবেন।
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট আসন ২৯টি হলেও বসিরহাট আসনটি শূন্য রয়েছে। দলত্যাগবিরোধী আইনের বিধান অনুযায়ী, বৈধ বিভাজনের জন্য দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সেই হিসাবে ন্যূনতম ১৯ জনের সমর্থন দরকার ছিল, আর বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাবি তারা ২০ জনের সমর্থন পেয়েছে।
যদি এই বিভাজন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়, তাহলে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন অংশ নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে দাবি করতে পারে এবং ভবিষ্যতে দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’-এর ওপরও অধিকার দাবি করার সুযোগ পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপির বিভাজনের মতোই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
এদিকে বিদ্রোহী সাংসদ শর্মিলা সরকার জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমে ছিল। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে অনেক সাংসদই নিজেদের এলাকায় কার্যকরভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। সেই কারণেই তাঁরা আলাদা সংসদীয় পরিচয়ের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী, এই ভাঙনের পর লোকসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মালা রায়, সায়নী ঘোষ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদ।
এই ঘটনাকে ঘিরে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন সবার নজর লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে, কারণ সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।

কোন মন্তব্য নেই