নয়া রণকৌশলে ইরান, বিপাকে মার্কিন প্রতিরক্ষা
ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে যুদ্ধ কৌশল পরিবর্তন করছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিমান প্রতিরক্ষা লক্ষ্য, এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট।
হোয়াইট হাউস ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কথার সুরে এখন বিস্তর ফারাক। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধে নিজেদের জয়ী ভাবলেও পেন্টাগনের অন্দরমহলে বিরাজ করছে চাপা শঙ্কা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র আক্রমণের জবাবে অভাবনীয়ভাবে নিজেদের সমরনীতি পরিবর্তন করেছে ইরানি সামরিক বাহিনী।
টানা ১১ দিন ধরে চলা এই সংঘাতে তেহরান এখন সরাসরি পেশিশক্তি প্রদর্শনের বদলে মার্কিন বাহিনীর সবচেয়ে দুর্বল দিকগুলোতে আঘাত হানার পথ বেছে নিয়েছে।
লক্ষ্য এখন রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করাই এখন ইরানের প্রধান কৌশল। সরাসরি সংঘাতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সমকক্ষ হওয়া অসম্ভব—এটি মেনেই তেহরান এই বুদ্ধিদীপ্ত পথে হাঁটছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, এই ভয়াবহ আক্রমণের মুখে কোনোক্রমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। আর এই টিকে থাকাকেই তারা নিজেদের ‘বিজয়’ বলে গণ্য করবে।
পেন্টাগনের হিসাবনিকাশ যে তেহরানের নখদর্পণে, তার প্রমাণ মিলেছে ইরাকের ইরবিলে। সেখানকার একটি অভিজাত হোটেলে মার্কিন সেনাদের অবস্থানের সুনির্দিষ্ট খবর পেয়েই সেখানে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।
ফুরোচ্ছে মার্কিন ইন্টারসেপ্টর, আসছে নতুন শঙ্কা
বর্তমানে এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা ও সম্পদকে সুরক্ষা দেওয়া আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের জুনে মাত্র ১২ দিনের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মজুত থাকা মোট ‘থাড’ (THAAD) ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ২০ থেকে ৫০ শতাংশই খরচ হয়ে গিয়েছিল।
জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির ইরান-বিষয়ক বিশ্লেষক ভ্যালি আর নাসর এই পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ইরান অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিজেদের ভুল থেকে শিখছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টরের মজুত ও সীমাবদ্ধতা কোথায়, তা তেহরান ধরে ফেলেছে। মজুত কমে এলেই ইরান হয়তো তাদের আরও আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যবহার শুরু করবে বলে নাসর ধারণা করছেন।
সতর্কবার্তা ছাড়াই আকস্মিক হামলা
আগে ইরান যেকোনো বড় হামলার আগে একধরনের প্রচ্ছন্ন সতর্কবার্তা দিত। গত বছর ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার আগে তেহরান আগাম বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু এবারের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিনা সতর্কতায় তারা কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটির অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বাদ যায়নি কুয়েতের আলী আল সালেম ও আরিফজান ঘাঁটির যোগাযোগ অবকাঠামোও। এর আগে কেবল ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়া হলেও, এখন অত্যন্ত সস্তা ড্রোনের ঝাঁক ধেয়ে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও ইরাকে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোর দিকে।
হতাহতের হিসাব ও পেন্টাগনের ভাষ্য
পেন্টাগন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সংঘাতে ৭ মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মাঝে ১০৮ জন অবশ্য দায়িত্বে ফিরেছেন। বিপরীতে ইরানের দাবি, তাদের প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন মারা গেছেন, যাঁদের সিংহভাগই সাধারণ নাগরিক। এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের পাল্টা হামলায় প্রাণ গেছে অন্তত ৩০ জনের।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানের এই মাত্রার ক্ষোভ তাঁরা আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি। যদিও এই পদক্ষেপকে তিনি তেহরানের ‘বড় ভুল’ ও ‘হতাশার প্রতিফলন’ আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ইরানের কৌশল পরিবর্তনের কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া জবাবের মুখে গত কয়েক দিনে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৩ শতাংশ কমে গেছে।
নেতৃত্বশূন্য হলেও অটুট কমান্ড কাঠামো
এত কিছুর পরও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মাথাব্যথা কমছে না। কারণ, এখনো ইরানের হাইপারসনিক ও অন্যান্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সব কটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের অবস্থান পেন্টাগনের অজানা। ধারণা করা হচ্ছে, বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের জন্য এগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, যুদ্ধের একেবারে শুরুতেই সর্বোচ্চ নেতাকে হারানোর পরও ইরানের সামরিক কাঠামো বিন্দুমাত্র ভেঙে পড়েনি। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাদের কার্যক্রমে মনেই হচ্ছে না যে শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ।

কোন মন্তব্য নেই