ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার বারুদগন্ধ এবার আছড়ে পড়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের আঙিনায়। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং ৫ শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় আগামী জুনের ফুটবল মহাযজ্ঞে দেশটির অংশগ্রহণ এখন সুতোর ওপর ঝুলছে।
যুদ্ধের উত্তেজনায় অনিশ্চিত ইরানের ২০২৬ বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে ফিফার সিদ্ধান্ত, ট্রাম্পের ভিসা নীতি এবং সম্ভাব্য বিকল্প দল নিয়ে বিশ্লেষণ। বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে কী ঘটতে পারে জানুন বিস্তারিত।
ইরান রেড ক্রিসেন্টের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন ইরানি প্রাণ হারিয়েছেন। এমন রক্তাক্ত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে ইরান আদৌ পা রাখবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা।
সংকটের মূলে তিন কারণ
ফুটবল বোদ্ধারা ইরানের অংশগ্রহণের পথে প্রধানত তিনটি বড় বাধা দেখছেন:
- প্রতিবাদের ভাষা: নিজ দেশের ওপর এমন বিধ্বংসী হামলার জেরে প্রতিবাদ হিসেবে ইরান নিজেই বিশ্বকাপ বর্জনের ডাক দিতে পারে।
- নিরাপত্তার শঙ্কা: যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে শত্রুভাবাপন্ন দেশে ইরানি ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ফিফার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
- ভিসা জটিলতা: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই ইরানিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে কঠোরতা আরোপ করেছে। যদিও খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ছাড়ের আশ্বাস ছিল, কিন্তু যুদ্ধের ডামাডোলে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ফিফা ও ইরানের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে মিলছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ফিফা সাধারণ সম্পাদক মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রোম অভয় দিয়ে বলেছেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য একটি নিরাপদ বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া।” ফিফার অন্দরমহলের খবর, সূচিতে এখনো কোনো কাঁচি চালানো হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানের ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি মেহেদি তাজ শুনিয়েছেন হতাশার বাণী। সংবাদমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “রক্তক্ষয়ী হামলার পর আমাদের বিশ্বকাপ খেলার প্রত্যাশা করাটা বাড়াবাড়ি।” চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন আর ফেডারেশনের হাতে নেই, তা চলে গেছে দেশটির উচ্চপদস্থ ক্রীড়া নীতিনির্ধারকদের কোর্টে।
ট্রাম্পের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও রাজনীতির মারপ্যাঁচ
হোয়াইট হাউসে ফেরার আগে ২০২৬ বিশ্বকাপকে ‘সবার জন্য উন্মুক্ত’ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। গত ডিসেম্বরে ড্র অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চাওয়া ইরানি প্রতিনিধিদের ভিসা আটকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানি সাফ জানিয়ে দেন, ভিসার বিষয়টি সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ সঙ্গে যুক্ত।
ইরান সরে গেলে কী ঘটবে?
বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসরের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে ইরান। শেষ মুহূর্তে তারা নাম প্রত্যাহার করলে ফিফার নীতিমালার (অনুচ্ছেদ ৬.৫ ও ৬.৭) বিশেষ ক্ষমতাবলে দুটি দৃশ্যপট তৈরি হতে পারে:
- সংক্ষিপ্ত গ্রুপ: ইরানকে ছাড়াই তিন দলের গ্রুপ হিসেবে খেলা চালানো।
- বিকল্প দলের অন্তর্ভুক্তি: ইরানের শূন্যস্থানে নতুন কোনো দেশকে সুযোগ দেওয়া।
কপাল খুলতে পারে যাদের
ইরান বাদ পড়লে এশীয় বাছাইপর্বের সমীকরণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্ভাবনা জোরালো হতে পারে, যারা প্লে-অফে ইরাকের কাছে হেরেছিল। এদিকে ইরাক যদি মেক্সিকোতে আসন্ন ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফে (বলিভিয়া বা সুরিনামের বিপক্ষে) হেরে যায়, তবে তারাও বিকল্প দল হিসেবে বিবেলয় হতে পারে। আবার প্লে-অফে জয়ী হলে ইরাক তো সরাসরিই খেলবে। এ ছাড়া ফিফা চাইলে অন্য মহাদেশের প্লে-অফে হেরে যাওয়া দলকেও বিবেচনা করতে পারে।
অতীত কী বলে?
বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর নজির আধুনিক ফুটবলে বিরল। ১৯৫০ সালে ভারত, স্কটল্যান্ড ও তুরস্কের সরে দাঁড়ানোর পর এমন ঘটনা আর বড় পরিসরে দেখা যায়নি। তবে যুদ্ধের কারণে আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনো খড়গ নেমে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফিফার আইনে এমন পরিস্থিতির জন্য আয়োজককে শাস্তির কোনো বিধান নেই, আর অন্য দেশগুলোও বয়কটের পথে হাঁটেনি।


কোন মন্তব্য নেই: