নিজস্ব প্রতিবেদক
৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত একাধিক মেধাবী প্রার্থী পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতায় চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন। নিয়োগ বঞ্চনার অভিযোগ, পরিবারের হতাশা ও সরকারের আশ্বাস নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের পরও চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এনেছে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়াকে। ৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত একাধিক মেধাবী প্রার্থী গেজেটে স্থান না পাওয়ায় তাঁদের পরিবারে নেমে এসেছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। অভিযোগ উঠেছে, একটি নেতিবাচক পুলিশি প্রতিবেদনের কারণে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অর্জন মুহূর্তেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সংগ্রামের পথ পেরিয়ে শীর্ষে, তবু নিয়োগ অনিশ্চিত
রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার নলপুকুরিয়া গ্রামের সন্তান শামীম শাহরিয়ার ছোটবেলা থেকেই সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তাঁর বাবা হাতেম আলী একজন কৃষক, যিনি সন্তানের সাফল্যকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখতেন।
৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুযোগ পেয়েও বাবার ইচ্ছা পূরণে তিনি সেই নিয়োগ গ্রহণ করেননি। লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক পেশা। পরবর্তী পরীক্ষায় তিনি ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর দেখা যায়, তালিকায় তাঁর নাম নেই। বিষয়টি জানার পর পরিবারে নেমে আসে গভীর হতাশা।
হাতেম আলীর ভাষায়, তিনি কখনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না; তবু কেন তাঁর ছেলের নিয়োগ আটকে গেল—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
নদীর জলে শ্রম, সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন উজ্জ্বল মল্লিক, যিনি ৪৮তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও গেজেট পাননি। তাঁর বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা এলাকায়। বাবা নারায়ণ মল্লিক পেশায় জেলে; কঠিন শীতেও পানিতে নেমে মাছ ধরে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন।
তাঁর প্রশ্ন—পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে সফল হওয়ার পরও যদি চাকরি না মেলে, তবে সাধারণ মানুষের সন্তানদের সামনে আশা কোথায়?
৪৪তম বিসিএসে একাধিক প্রার্থী একই সমস্যায়
৪৪তম বিসিএসে প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়া আরও কয়েকজন প্রার্থীও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাব্বি লেলিন আহমেদ, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষার্থী। তিনি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য ফলাফল করেছিলেন এবং নিজের যোগ্যতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বা মামলার ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে তাঁর নিয়োগ আটকে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তত ১১ জন প্রার্থী এ ধরনের জটিলতায় পড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র
৪৮তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) নিয়োগেও একই অভিযোগ সামনে এসেছে। সুপারিশপ্রাপ্ত ২১ জন চিকিৎসক চূড়ান্ত গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ–এর সাবেক শিক্ষার্থী।
ভুক্তভোগীদের একজন ডা. সিরাজাম মুনিরা জানান, ছাত্রজীবনে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ না নেওয়ার পরও তাঁর নিয়োগ আটকে গেছে, যা তাঁকে বিস্মিত করেছে। একইভাবে ডা. উজ্জ্বল মল্লিকসহ আরও অনেক চিকিৎসকের পরিবার দীর্ঘ ত্যাগের পর এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মত: সাংবিধানিক প্রশ্ন
আইনজ্ঞদের মতে, যাচাই প্রক্রিয়া প্রয়োজন হলেও তা যেন বৈষম্যের কারণ না হয়। মানজুর–আল–মতিন, যিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট–এর আইনজীবী, বলেন—প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ ছাড়া পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ আটকে দেওয়া সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পুনরায় যাচাইয়ের আশ্বাস
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা আবেদন জমা দিয়েছেন এবং বিষয়টি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনসংযোগ কর্মকর্তা মানসুর হোসেন জানিয়েছেন, আবেদনগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেছেন, কোনো মেধাবী প্রার্থী যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং পুরো পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে প্রশ্ন
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাচাই প্রক্রিয়া জরুরি হলেও তা যেন অস্বচ্ছ বা রাজনৈতিক বিতর্কের উৎস না হয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন ও মেধাকেন্দ্রিক প্রশাসন গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই নিয়োগ সংকট তার বাস্তব পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—কঠোর পরিশ্রমে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া কৃষক বা জেলে পরিবারের ত্যাগের যথাযথ মূল্য রাষ্ট্র দিতে পারবে কি না।

কোন মন্তব্য নেই: