সাভারে চামড়া আসছে, দাম নিয়ে ক্ষোভ।
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬
ঈদুল আজহার পর সাভারের হেমায়েতপুর চামড়াশিল্প নগরে আসতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর চামড়া। রাত ৮টা পর্যন্ত পৌঁছেছে ৭৯ হাজারের বেশি কাঁচা চামড়া। তবে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কম দাম পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিক্রেতারা।
সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা চামড়াশিল্প নগরে ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চামড়া আসা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকভর্তি কাঁচা চামড়া শিল্পনগরে পৌঁছাতে থাকে। রাত ৮টা পর্যন্ত সেখানে জমা হয়েছে ৭৯ হাজার ২১৮ পিস কাঁচা চামড়া। তবে বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক বিক্রেতা।
চামড়া খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিসিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ১ কোটি পিস কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বিসিক, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকেই চামড়াশিল্প নগরের বিভিন্ন ট্যানারিতে কর্মব্যস্ততা বাড়তে দেখা যায়। কোথাও ট্রাক থেকে চামড়া নামানো হচ্ছে, আবার কোথাও দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজ চলছে। ট্যানারি মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা চামড়া প্রক্রিয়াজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
এদিকে চামড়া বিক্রি করতে আসা অনেকেই অভিযোগ করেন, সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের মিল নেই। গত ১৩ মে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির খাত–সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেন। সেই অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ধরা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
সাধারণ হিসাবে ছোট আকারের লবণযুক্ত চামড়ার মূল্য ৯৯০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, মাঝারি চামড়ার মূল্য ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং বড় চামড়ার মূল্য ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
তবে বাস্তবে কাঁচা চামড়ার বাজারে মিলছে অনেক কম দাম। ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, একটি চামড়া সংরক্ষণে লবণ ও শ্রমিক ব্যয় বাবদ গড়ে প্রায় ৩৫০ টাকা খরচ হয়। সে হিসাবে ছোট আকারের কাঁচা চামড়ার দাম ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, মাঝারি আকারের চামড়া ৯৫০ থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ১ হাজার ৫৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে থাকার কথা।
বিকেলে নয়ারহাট এলাকা থেকে ১৩২ পিস চামড়া নিয়ে আসেন মাওলানা মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সারা দিনের পরিশ্রম ও পরিবহন খরচের পরও প্রতি পিস চামড়ার দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বলা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরেই চামড়া খাতে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে।
ধামরাইয়ের একটি মাদ্রাসা থেকে ৫০ পিস চামড়া নিয়ে আসা মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান শাহ্জলি বলেন, কোথাও ৩০০ টাকা আবার কোথাও ৪০০ টাকা দাম বলা হচ্ছে। অথচ গত বছর একই ধরনের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন তারা।
অন্যদিকে রাজধানীর আগারগাঁও থেকে ৭৫ পিস চামড়া নিয়ে আসা হাফেজ মোহাম্মদ ইয়াসিন জানান, অনেক দরদামের পর শেষ পর্যন্ত প্রতি পিস ৬৬০ টাকা করে দাম পেয়েছেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক ও সমতা লেদারের মালিক মো. মিজানুর রহমান বলেন, এ বছর গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়ার চামড়া মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি পিস সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগতে পারে প্রায় তিন মাস।
তিনি বলেন, কোরবানির পর চার থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে চামড়া সংরক্ষণ না করলে এর মান দ্রুত কমে যায়। গুণগত মানের ওপরই মূলত দাম নির্ভর করে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, সাভার ট্যানারি স্টেট, আশপাশের আড়ত ও ঢাকার পোস্তায় বর্তমানে প্রতি পিস চামড়া গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু উন্নত মানের চামড়া ৮০০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কাঁচা চামড়া কেনার পর লবণ, শ্রমিক, পরিবহন ও গুদাম ভাড়াসহ প্রতি পিসে আরও ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা ব্যয় হয়। সেই বিবেচনায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনাবেচা অস্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হলে বিক্রেতারা আরও ভালো দাম পেতে পারেন বলে মত দেন তিনি।
বিসিক চামড়াশিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহরাজুল মাঈয়ান জানান, রাত ৮টা পর্যন্ত ৭৯ হাজার ২১৮ পিস কাঁচা চামড়া শিল্পনগরে প্রবেশ করেছে। সময়ের সঙ্গে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। চামড়া ক্রয়-বিক্রয় ও সার্বিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবকসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর কাজ করছে বলেও জানান তিনি

কোন মন্তব্য নেই