যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কোডাকের ব্যবসা, মূল ভরসা সেই ফিল্ম
প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩০
দেউলিয়া অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কোডাক। ফিল্ম ব্যবসার উপর ভর করে নতুন করে সফলতার পথে প্রতিষ্ঠানটি। জানুন কোডাকের পুনরুত্থানের পুরো গল্প, মুনাফা বৃদ্ধি, হলিউডের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
ফিল্মেই কোডাকের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ সময়ের সংকট, দেউলিয়া অবস্থা এবং ডিজিটাল যুগের চাপ কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান ইস্টম্যান কোডাক। অবাক করার মতো বিষয় হলো—এই পুনরুত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে সেই পুরোনো ফিল্ম ব্যবসাই।
এক ফোনকল বদলে দেয় দিকনির্দেশনা
২০১৯ সালে নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দিনই জিম কন্টিনেনজা এক অপ্রত্যাশিত বার্তা পান হলিউডের একজন খ্যাতিমান পরিচালকের কাছ থেকে। তিনি সতর্ক করেছিলেন, কোডাক একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তখন কোম্পানিটি তাদের অ্যাসিটেট উৎপাদন কারখানা বন্ধ করার পথে ছিল—যা ফিল্ম তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান সরবরাহ করে। ‘ইনসেপশন’ ও ‘ওপেনহাইমার’-এর নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান সরাসরি অনুরোধ জানান, এই সিদ্ধান্ত যেন পুনর্বিবেচনা করা হয়।
পরে কন্টিনেনজা জানান, তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। একজন শীর্ষ নির্মাতা কেন এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন—এই প্রশ্ন থেকেই তাঁর ভাবনার পরিবর্তন শুরু হয়।
ঐতিহ্যের দিকেই ফিরল নজর
দায়িত্ব নেওয়ার পর কন্টিনেনজা দ্রুত উপলব্ধি করেন, কোডাকের শক্তির মূল জায়গা তার ফিল্ম ব্যবসা। সেই জায়গাকে ঘিরেই তিনি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সাজান।
এর ফলও দেখা যেতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালে একাধিক অস্কারজয়ী সিনেমা—যেমন ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ও ‘সিনার্স’—এই কোম্পানির ফিল্ম ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছে। হলিউডে ফিল্মের প্রতি পুরোনো টান এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহ মিলিয়ে বাজারে আবার চাহিদা বাড়ছে।
কঠিন সময়ের স্মৃতি
কোডাকের জন্য এই অবস্থানে আসা সহজ ছিল না। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া সুরক্ষার আশ্রয় নেয় এবং পরের বছর সীমিত আকারে কার্যক্রম শুরু করে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার কোম্পানিটিকে বড় চাপে ফেলে। সময়মতো অভিযোজন করতে না পারায় আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ২০১৪ সালে শেয়ারের বড় পতন ঘটে এবং কয়েক বছরের মধ্যে তা আরও কমে যায়। মহামারির শুরুর দিকে ২০২০ সালে শেয়ারের দাম নেমে আসে মাত্র ১.৫৫ ডলারে।
এমনকি গত বছরও কোম্পানিটি স্বীকার করেছিল, তাদের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা কমে যায় ১২ শতাংশ এবং ঋণের চাপও ছিল উল্লেখযোগ্য।
উন্নতির ইঙ্গিত স্পষ্ট
তবে সাম্প্রতিক সময়ে চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে কোম্পানির মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৬৭ মিলিয়ন ডলার—যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি।
একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার সুদের খরচ কমানো সম্ভব হয়েছে, যা তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করেছে।
পুনর্গঠন ও ঋণ হ্রাস
- কন্টিনেনজার নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে।
- প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
- ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।
- প্রিন্টিং, উন্নত উপকরণ এবং রাসায়নিক খাতকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর দিকেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের আগ্রহ
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন–জি, ফিল্মভিত্তিক ছবি ও ভিডিওর প্রতি নতুন করে আকৃষ্ট হচ্ছে। কন্টিনেনজার মতে, ফিল্মের মাধ্যমে ধারণ করা দৃশ্য মানুষের আবেগকে আরও গভীরভাবে ছুঁতে পারে।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোডাক আবার ফিল্ম উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং ঋণ পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে আর্থিক ভিত্তি মজবুত করেছে।
বাজারে ইতিবাচক প্রতিফলন
এই পরিবর্তনের প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। গত এক বছরে কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
সামনে এগোনোর লক্ষ্য
কন্টিনেনজা জানিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য শুধু ব্যবসায়িক লাভ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সময়ের ধাক্কায় পিছিয়ে পড়া কোডাক এখন পুরোনো শক্তিকেই কাজে লাগিয়ে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে—আর সেই পথের প্রধান ভরসা ফিল্ম।

কোন মন্তব্য নেই