জ্বালানি সংকটে ৩০০ কোটি ডলার জরুরি ঋণের সন্ধানে সরকার

মোঃ রাফি, ঢাকা | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৪

বাংলাদেশ অর্থনীতি, ডলার সংকট, বাংলাদেশ ঋণ, IMF loan Bangladesh, World Bank loan Bangladesh, জ্বালানি তেলের দাম, LNG price increase, fertilizer price increase, Bangladesh reserve crisis, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, budget support Bangladesh, Bangladesh economic crisis 2026, oil price impact Bangladesh, gas price Bangladesh, subsidy Bangladesh, Bangladesh import cost, Middle East war impact, global oil crisis, Bangladesh loan news, Bangladesh finance ministry

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বৃদ্ধিতে চাপে বাংলাদেশ। বাড়তি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি সামাল দিতে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ নিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিস্তারিত পড়ুন।


মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। বাড়তি দামে এসব পণ্য কিনতে আগামী চার মাসে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে বলে সরকারি হিসাব বলছে। একই সময়ে ভর্তুকির চাপ দাঁড়াতে পারে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকায়।

এই আর্থিক চাপ সামাল দিতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মার্চ থেকে জুন সময়কালের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে এই অর্থ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ থেকে।

ঋণের সম্ভাব্য ব্যবহার

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত ঋণ তিনটি প্রধান খাতে কাজে লাগানো হবে—
  • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা
  • জ্বালানি, খাদ্য ও সারের আমদানি নির্বিঘ্ন রাখা
  • অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ

এছাড়া নির্দিষ্ট শ্রেণির জনগণের জন্য সীমিত সময়ের সহায়তাও এই তহবিল থেকে দেওয়া হতে পারে।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব

ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবুও গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এখনো চালু হয়নি, ফলে অনিশ্চয়তা কাটেনি।

সরকারি বিশ্লেষণ অনুযায়ী—

  • ডিজেলের আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছে প্রায় ২৫০ শতাংশ
  • এলএনজির দাম দ্বিগুণ হয়েছে
  • সারের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ

ফলে আমদানির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে ৩০১ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল, সেখানে এবার তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।

রিজার্ভ ও বাজেটের ওপর চাপ

International Monetary Fund-এর নির্ধারিত পদ্ধতিতে হিসাব করলে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকলেও মার্চে তা কমে প্রায় ২৯ বিলিয়নে নেমে এসেছে।

আরো পড়ুন,

এদিকে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা, যেখানে বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।

ঋণ পেতে তৎপরতা

জরুরি অর্থায়নের জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
  • World Bank
  • International Monetary Fund
  • Asian Development Bank
  • Asian Infrastructure Investment Bank

তবে অতীতে এসব সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে নানা শর্ত মানতে হয়েছে বাংলাদেশকে। নতুন করে ঋণ পেতে গেলে সেই সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

অতীতের অভিজ্ঞতা

২০২২ সালে Russia-Ukraine War শুরু হওয়ার পর একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। তখন বৈদেশিক রিজার্ভ দ্রুত কমে যায় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে অবমূল্যায়িত হয়। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ে।

বাড়ছে ঋণের বোঝা

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে। ফলে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাজেট সহায়তা চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে উন্নয়ন সহযোগীরা সরকারের নীতিগত পদক্ষেপ, রাজস্ব সংগ্রহ এবং জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

সামনে অনিশ্চয়তা

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও জ্বালানির বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে দামের চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং জনগণের ওপর চাপ কম রাখা—দুই দিক সামলানোই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.