নিজস্ব প্রতিবেদক:
তেহরানের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী, তখন নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকে চলছে এক গভীর ও অর্থবহ নিস্তব্ধতা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও, ভারতের প্রতিক্রিয়া যেন এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই ‘কৌশলী অবস্থান’ ভারতের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কফিনে শেষ পেরেক কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।
জেরুজালেমের আলিঙ্গন ও পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা
কাকতালীয় হলেও ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খামেনি হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুদিন আগেই তেল আবিব ছেড়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬—জেরুজালেমের ইয়াদ ভাশেম স্মৃতিসৌধে দাঁড়িয়ে তিনি যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি সংহতি জানাচ্ছিলেন, তখন হয়তো পশ্চিম এশিয়ার মানচিত্র বদলের ছক কষা হচ্ছিল। গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং ব্রিকস জোটে ভারতের মিত্র রাশিয়া-চীনের ইসরায়েল বিমুখতার পরেও, মোদির এই সফর এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ভারতের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নয়াদিল্লির বিবৃতি: কূটনৈতিক চাল না কি পক্ষপাতে?
ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে না দেখে ভারত সরকার বেছে নিয়েছে এক ভিন্ন পথ। ঘটনার পরপরই মোদির বক্তব্যে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কোনো নিন্দা ছিল না; বরং তিনি সরব ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনায়। পরবর্তীতে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করলেও, যে কূটনৈতিক আলোচনার মাঝপথে এই হামলা চালানো হলো, সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে ভারত টুঁ শব্দটিও করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের সনদের ২ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এই আঘাতের বিরুদ্ধে ভারতের চুপ থাকা কার্যত হামলাকারীদের পরোক্ষ সমর্থনেরই নামান্তর।
বিস্মৃত অতীত ও কাশ্মীর সমীকরণ
বর্তমান সরকারের এই অবস্থানে বিস্মৃত হয়েছে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের খতিয়ান। ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত যখন কোণঠাসা, তখন ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এসেছিল তেহরান। ওআইসি-তে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব রুখে দিয়ে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইরান। পাকিস্তান সীমান্তে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা কিংবা জাহেদানে ভারতের উপস্থিতি—সবই ছিল ইরানের সহযোগিতার ফসল। অটল বিহারি বাজপেয়ির জমানায় গড়ে ওঠা সেই সম্পর্কের উষ্ণতা আজ ফিকে হয়ে গেছে।
শ্রীনগরের রাস্তায় ক্ষোভ ও দমননীতি
আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়েছে ভারতের অভ্যন্তরেও। খামেনি হত্যার প্রতিবাদে কাশ্মীরের শ্রীনগরে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ রাস্তায় নামলে প্রশাসনিক কঠোরতার মুখে পড়ে। গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় ছত্রভঙ্গ করা হয় বিক্ষোভকারীদের, জারি করা হয় কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
সোনিয়া গান্ধীর তোপ: ‘বিশ্ববিবেকের মৃত্যু’
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং দলটির নেত্রী সোনিয়া গান্ধী মোদি সরকারের এই ভূমিকাকে ‘বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ভারত সবসময় ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের কথা বলে এসেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখা ভারত আজ যখন একতরফা আগ্রাসনের মুখেও নিশ্চুপ থাকে, তখন ছোট দেশগুলোর কাছে ভুল বার্তা যায়। সোনিয়া গান্ধীর ভাষ্যমতে, এই নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষ থেকে ভারতের সরে আসার ইঙ্গিত। পার্লামেন্টে এ নিয়ে অবিলম্বে খোলামেলা বিতর্কের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস।
শেষ কথা
উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত কোটি ভারতীয়র নিরাপত্তা এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা—উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের বর্তমান ভূমিকা এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন একে দিয়েছে। একসময় যে ভারত ছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের পুরোধা, আজ তার পররাষ্ট্রনীতি কি কেবলই পরাশক্তির ইচ্ছানির্ভর? উত্তর খুঁজছে

কোন মন্তব্য নেই: