নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি তারেক রহমানের
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
জাতির উদ্দেশে ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, আসন্ন নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্বাচন। এক কোটি কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, নারী শিক্ষা ও নিরাপদ মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
আসন্ন নির্বাচনকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার নির্বাচন।
সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ওই ভাষণে তারেক রহমান একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের মূল লক্ষ্য তুলে ধরেন।
তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নাগরিকদের হারানো রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগ। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বিএনপি দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে ইশতেহার ঘোষণা করেছে। একটি আত্মনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে প্রতিটি সেক্টরকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের মৌলিক অধিকার পুনর্বহাল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ নিশ্চিত করাই বিএনপির নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তরুণ সমাজ, বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীদের কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ওপর।
ভাষণের শুরুতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন–সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সামনে এসেছে।
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এই সময়ে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানুষদের গুম, খুন ও অপহরণের শিকার হতে হয়েছে। ‘আয়নাঘর’ নামের বন্দিশালাকে তিনি জ্যান্ত মানুষের কবরস্থান হিসেবে আখ্যা দেন। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ১৪ শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং তিন হাজারের বেশি মানুষের আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বিস্মৃত হবে না। তিনি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহত ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের বড় পরিকল্পনার কথাও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে পর্যায়ক্রমে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে নারীপ্রধান পরিবারের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এই কার্ডের আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা বা সমমূল্যের খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালু করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা, সার ও বীজ ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, নারীদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ অব্যাহত থাকবে। কর্মক্ষেত্রে ডে–কেয়ার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন, নারীদের জন্য বিশেষ ইলেকট্রিক পরিবহন চালু করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। নারী নির্যাতন ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও জানান। শহরাঞ্চলে নারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও কর্মমুখী করতে মাধ্যমিক স্তর থেকেই কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথা জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ রাখার কথাও বলেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর’ নীতির কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান জানান, সারা দেশে এক লক্ষ হেলথ কেয়ারার নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হবেন এবং তাঁরা ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ দেবেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাভিত্তিক প্রশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মানদণ্ড। সরকারি কর্মচারীদের জন্য সময়মতো জাতীয় পে স্কেল কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে প্রতিবছর দেশ থেকে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই অর্থ পাচার বন্ধ করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ হবে এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের জন্য জামানতবিহীন সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।
ধর্মীয় বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, সংবিধানে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ নীতিতে সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন তিনি। ইমাম, মোয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের জন্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথাও বলেন।
ভাষণের শেষ অংশে আবেগঘন কণ্ঠে দেশবাসীর কাছে ধানের শীষে ভোট চান বিএনপির চেয়ারম্যান। অতীতের কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুলের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষের প্রার্থীদের নির্বাচিত করুন, আর পরদিন থেকেই তাঁরা জনগণের সেবায় দায়িত্ব পালন করবেন। তরুণ ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জীবনের প্রথম ভোট যেন ধানের শীষের পক্ষেই দেওয়া হয়।

কোন মন্তব্য নেই