নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখনো সেই পুরোনো প্রথাগত কায়দাতেই পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
আরো পড়ুন,
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’: অধ্যাপক সিদ্দিকীনাজমুলের পদত্যাগ দাবি ক্রিকেটারদের: কাল থেকে খেলা বন্ধের হুঁশিয়ারি
শুক্রবার খালেদা জিয়ার নাগরিক শোকসভায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি সরকারের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন
কারওয়ান বাজার দখলে বিদেশে বসে খুনের নকশা: ১৫ লাখে ভাড়াটে খুনি দিয়ে মোছাব্বির হত্যা
শনিবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ (ব্রেইন) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল ‘আগামী নির্বাচিত সরকার ও নাগরিক প্রত্যাশা’।
পরিবর্তনের নামে পুরোনো বন্দোবস্ত
সংলাপে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বর্তমান শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে এত রক্তপাত ও আত্মত্যাগের পরও আমলাতন্ত্রের ধরনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, “আমরা নতুন বন্দোবস্তের নাম দিয়ে আসলে পুরোনো বন্দোবস্তকেই পুনরুত্থান করেছি। আমলাতন্ত্রের গায়ে সামান্য আঁচড়ও লাগেনি, বরং পদ-পদবি ভাগাভাগির সেই চেনা সংস্কৃতিই ফিরে এসেছে।” তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নামের আড়ালে বর্জনমূলক রাজনীতি’ হিসেবে অভিহিত করেন।
দঙ্গলবাজি ও সামাজিক অস্থিরতা
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ক্রমবর্ধমান সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি মন্তব্য করেন, পরাজিত শক্তিগুলো জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের কোনো নতুন সামাজিক চুক্তি হতে দিতে চায় না। অপপ্রচারের মাধ্যমে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা এখন ‘দঙ্গলবাজি’ বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান মনে করেন, বিগত সরকারের ‘রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ’ এখন ‘জনতুষ্টিবাদী ফ্যাসিবাদে’ (পপুলার ফ্যাসিজম) রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন অদক্ষ ও স্থবির আমলাতন্ত্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যেখানে সত্য কথা বলাটা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হুমকির মুখে বাকস্বাধীনতা ও নারী অধিকার
সংলাপে নারীদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি অভিযোগ করেন, যে বাকস্বাধীনতার জন্য অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেখানেই এখন আঘাত হানা হচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইনে রাজনৈতিক মতামত প্রদানকারী নারীরা ভয়াবহ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতির কারণে অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের মতামত সংকুচিত করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তিনি জানান।
আগামী দিনের প্রত্যাশা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত করাই হবে পরবর্তী সরকারের প্রধান পরীক্ষা। সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন আশা প্রকাশ করেন যে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার জনগণের ম্যান্ডেটের মর্যাদা রক্ষা করবে এবং এমন একটি সমাজ গঠন করবে যেখানে সবার সমান অধিকার ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার পরিবেশ থাকবে।
লেখক ফিরোজ আহমেদ ‘মব’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কোন মন্তব্য নেই: