নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
মোছাব্বির খুনের রহস্য ফাঁস! চুক্তি ছিল নগদ টাকা ও নতুন মোটরসাইকেল।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মোছাব্বির হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ সাড়ে চার মাসের সুপরিকল্পিত ছক অনুযায়ী এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, দেশের বাইরে অবস্থানরত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে এবং অর্থায়নে এই খুনের মিশন সম্পন্ন হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল কারওয়ান বাজার এলাকার একক আধিপত্য বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
শনিবার রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন জেলায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তারা হলেন— শুটার জিন্নাত (২৪), সমন্বয়কারী বিল্লাল, অর্থ জোগানদাতা আব্দুল কাদির (২৮) এবং তথ্য সংগ্রহকারী মো. রিয়াজ (৩১)।
খুনের পেছনে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ও ১৫ লাখ টাকার মিশন
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। বিদেশে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসী, যিনি ওই সময় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, তিনি মোছাব্বিরকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এই কিলিং মিশন সফল করতে ১৫ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, সমন্বয়কারী বিল্লাল ও জাহিদুলকে বড় অংকের অর্থ এবং মামলার আইনি খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, মূল শুটার জিন্নাতকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা নগদ এবং একটি নতুন মোটরসাইকেল দেওয়ার কথা ছিল।
ব্যর্থ হয়েছিল প্রথম চেষ্টা, দ্বিতীয়বার সফল শুটাররা
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোছাব্বিরকে হত্যার পরিকল্পনা হুট করে নেওয়া হয়নি। বেশ কয়েকদিন ধরেই তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারি করছিলেন রিয়াজ। এমনকি গত বুধবারের সফল মিশনের দুই দিন আগেও তাকে একবার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে সেই দফায় সুযোগ না মেলায় পরিকল্পনা পরিবর্তন করে জিন্নাত ও আবদুর রহিমকে সরাসরি গুলি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বুধবার রাতে পশ্চিম তেজতুরী বাজারে মোছাব্বিরকে গুলি করে পালিয়ে যায় তারা।
যেভাবে ধরা পড়ল খুনিরা: হোটেল থেকে গোপন আস্তানা
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর খুনিরা বেশ চতুরতার সাথে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। ডিবির ভাষ্যমতে:
খুনের পর জিন্নাত, আবদুর রহিম ও রিয়াজ মহাখালী গিয়ে তাদের অস্ত্র জমা দেয়।
এরপর জিন্নাত ও বিল্লাল উত্তরার একটি আবাসিক হোটেলে রাত কাটান এবং সেখানে মাদক সেবন করেন।
নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে বিল্লাল উত্তরা থেকে তিনটি নতুন মোবাইল ফোন কেনেন।
পুলিশের নজর এড়াতে বিল্লাল মোটরসাইকেলে করে মানিকগঞ্জে এবং জিন্নাত গাজীপুরে পালিয়ে যান।
তবে ডিবির প্রযুক্তিগত নজরদারি ও অভিযানে শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। বিল্লালের কাছ থেকেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশের পর্যবেক্ষণ
রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে মূলত ব্যবসায়িক ও বাজার নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বই এই খুনের প্রধান কারণ। তিনি বলেন, "আমরা খুনের পরিকল্পনাকারী থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়কদের শনাক্ত করতে পেরেছি। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো উদ্ধারের চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।"
নিহত আজিজুর রহমান মোছাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় কারাবাস শেষে সম্প্রতি তিনি আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন।
কোন মন্তব্য নেই: