বিএনপি একক বিজয়, জামায়াতের বড় উত্থান: বাংলাদেশের নির্বাচনে দক্ষিণপন্থার প্রভাব
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে, জামায়াত ৬৮টি আসনে সাফল্য পেয়েছে। খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট। ভোটের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ দেশের গণতন্ত্রকে আপাতত রক্ষা করেছে।
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে রাজনৈতিক উৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। শীত বিদায়ের হালকা রোদ আর মৃদু বাতাসের মধ্যে এই দিনটি শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যও বিশেষ হয়ে থাকবে। ভোট ছিল নাগরিক অধিকার প্রয়োগের এক বাস্তব উদযাপন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ৫৯.৪৪ শতাংশ ছিল। যদিও ২০০৮ সালে এটি প্রায় ৮৭ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ৭৬ শতাংশ, তবে এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এতটাই অংশগ্রহণ আশা জাগানো।
গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের প্রশাসন দুর্বল এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নাগরিকদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। তবে ভোটের দিন সরকারের প্রস্তুতি, নির্বাচন কমিশনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করেছে।
৩০০ আসনের মধ্যে এক আসনে মৃত্যুজনিত কারণে নির্বাচন হয়নি এবং দুই আসনে আইনগত জটিলতায় ফলাফল স্থগিত। বাকি ২৯৭টি আসনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করেছে। তাদের জোটের মিত্ররা আরও তিনটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এটি দলটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিজয়। ১৯৭৯ সালে তারা ২০৭টি, ১৯৯১ সালে ১৪০টি এবং ২০০১ সালে ১৯৩টি আসন জিতেছিল।
এবার জামায়াতের বড় উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। এককভাবে তারা ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিশেষত খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে জামায়াতের কার্যক্রম এবং সুনির্দিষ্ট প্রচারণার কারণে এই ফলাফল এসেছে। খুলনায় ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টি, রংপুরে ১৬টি এবং রাজশাহীতে ১১টি আসন তারা জিতেছে।
ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জামায়াতের জয় বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। তরুণ ভোটারদের সমর্থন, স্থানীয় প্রচারণা এবং বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনের ফলাফল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক প্রবণতা বেড়েছে, সংখ্যালঘু ও নারীদের ওপর সাম্প্রতিক বছরের হিংসা ভোটের ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। নারীর প্রতিনিধিত্ব কম থাকায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সংসদ গঠনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, ভোটারদের ৩২ শতাংশ জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, আর বিএনপি পেয়েছে ৪৯.৬০ শতাংশ ভোট। বিএনপির জয় দেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্রকে আপাতত বাঁচিয়েছে, কিন্তু দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
এই নির্বাচন দেখিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো এবং নির্বাচন কমিশন যে সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে সক্ষম, তবু সামাজিক মেরুকরণ এবং স্থানীয় রাজনীতির জটিলতা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই