বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সংকট মোকাবিলা ও পররাষ্ট্রনীতিতে পেশাদারিত্ব ফেরাতে নতুন সরকারের করণীয় কী? সিজিএসের সংলাপে বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতের বিস্তারিত জানুন।
ঢাকা: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। এই সংকট কাটিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা পরবর্তী সরকারের জন্য প্রধানতম পরীক্ষা হবে। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক’ শীর্ষক সংলাপে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন বিশেজ্ঞরা। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
পেশাদার কূটনীতির আহ্বান
সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আমেনা মহসিন বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে অবশ্যই দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা হ্রাস ও ভিসা সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান জটিলতা মূলত একটি গভীর ‘ইমেজ ক্রাইসিসের’ ফল। এই পরিস্থিতি যেমন দেশের ভেতর থেকে তৈরি হয়েছে, তেমনি বাইরের শক্তিরও এতে ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর মব ভায়োলেন্সের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আত্মালোচনার প্রয়োজন আছে। পাশাপাশি ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে, তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
ভারসাম্যের রাজনীতি ও অর্থনীত
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী জানান, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সুষম সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে টিকে থাকার মূল কৌশল। তিনি বলেন, “সরাসরি বিনিয়োগ পেতে হলে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যা প্রকারান্তরে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকেও মজবুত করবে।”
সরকারি কার্যক্রমের ব্যবচ্ছেদ
সংলাপে বর্তমান প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনা করেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী। তার মতে, প্রধান উপদেষ্টা বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা দেখালেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। তিনি বলেন, “সাফল্য ছাড়াই প্রধান উপদেষ্টার বিদেশ সফরের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।”
বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান তুলে ধরে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই আমাদের বৈদেশিক নীতি সাজাতে হবে। অন্যদিকে, নতুন সংবাদমাধ্যম চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসান মনে করেন, জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গঠন করা অসম্ভব।
সংস্কার ও সংকট মোকাবিলা
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে অনেক সংস্কার কমিশন হলেও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কোনো কমিশন না হওয়াটা দুঃখজনক। তিনি বলেন, “জুলাই পরবর্তী সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক যেমন জটিল হয়েছে, তেমনি রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানেও আমরা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছি না।” এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে আরও মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, সাবেক সচিব মহসিন আলী খানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বক্তারা একমত হন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন অপরিহার্য।

কোন মন্তব্য নেই: