হাদির ওপর হামলা ঘিরে উদ্বেগ: নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে শঙ্কা
জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজধানীতে দিনের বেলায় একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে গুলির ঘটনার পর নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, এসব ঘটনায় নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ও এর পরিবেশ বজায় রাখা।
তারা উল্লেখ করেছে, ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এটি সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি হুমকি এবং মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, চট্টগ্রাম ও পাবনায় নির্বাচনী জনসংযোগের সময় গুলির ঘটনা ঘটলেও শরিফ ওসমানের ক্ষেত্রে এটি ভিন্ন চরিত্রের বলে মনে করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি-মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ ৫ নভেম্বর গণসংযোগের সময় আহত হন এবং এই ঘটনায় একজন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে পাবনা-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডলের জনসংযোগকে ঘিরে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে।
সরকারি সূত্রগুলো মনে করছে, নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করতেই এসব হামলা হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু পক্ষ আগে থেকেই নির্বাচন প্রতিহত করার হুমকি দিয়ে আসছিল, যা এরকম ঘটনার কারণ হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
তিনি জনগণ এবং সব রাজনৈতিক পক্ষকে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে। আসন্ন নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য সাধারণ নাগরিকদেরও সংযম প্রদর্শনের অনুরোধ করেছেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই একটি পক্ষের হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যারা নির্বাচন প্রতিহত করার ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। তারা নির্বাচনে অংশ না নিলে ভোট প্রতিহত করার ঘোষণা আসে।
এরই ধারাবাহিকতায় ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানোর ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ইউনিট এ ঘটনার তদন্তে কাজ করছে। একইসঙ্গে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) হামলাকারীদের সনাক্ত করতে কার্যক্রম শুরু করেছে। তারা বিশেষভাবে ঘটনার পেছনের কারণ এবং কারা জড়িত, তা বিশ্লেষণ করছে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মন্তব্য করেছেন যে দেশ এখন গভীর সংকটে রয়েছে। তিনি বলেন, একটি দল বা গোষ্ঠী দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে ষড়যন্ত্র করছে এবং এ হামলার ঘটনাকে সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অবৈধ অস্ত্রের পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল, যেখানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। তখন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অনেককে গ্রেপ্তার করা যায়নি এবং বেশিরভাগ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
পুলিশের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে, যা সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজধানীর বিজয়নগরে, যেখানে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, আগেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের নজির রয়েছে। পুরানা পল্টনের আশপাশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে শাহজাহানপুরে আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যার কথা উল্লেখ করা যায়।
এসব ঘটনায় অপরাধজগতের সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এলেও আওয়ামী লীগ এবং যুবলীগের কিছু নেতার নামও আলোচনায় এসেছে। জুলাই আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে। দলের সঙ্গে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে যেসব নেতার নাম প্রকাশ্যে আসে, তাদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কেউ এখনও গ্রেপ্তার হননি।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান মন্তব্য করেছেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসীদের হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে। তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে শিথিলতা দেখানো হলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তৎপর পরিস্থিতিতে পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন যে নির্বাচনকে ঘিরে কিছু শক্তি আতঙ্ক তৈরি করতে চেষ্টা করবে। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগের প্রেক্ষিতে ওসমান হাদির ঘটনার গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। কোনো প্রার্থী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এছাড়া, রাতের নিরাপত্তার পাশাপাশি দিনের নিরাপত্তা পরিকল্পনাও নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নির্বাচনবিরোধী পলাতক গোষ্ঠী একটি আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে, এ বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছি। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম
কোন মন্তব্য নেই